ঘুরে আসুন সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর থেকে | Travel to Tanguar Haor

সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের গল্প | Travel to Tanguar Haor

টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের বৃহত্তর সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলায় অবস্থিত একটি হাওর। প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এ হাওর বাংলাদেশর দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠা পানির জলাভূমি ।স্থানীয় লোকজনের কাছে হাওরটি নয়কুড়ি কান্দার ছয়কুড়ি বিল নামেও পরিচিত। এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার স্থান, প্রথমটি সুন্দরবন।

হাওরের গল্প @টাঙ্গুয়ার হাওর
সুনামগঞ্জ, সিলেট

অনেক দিনের ইচ্ছে ছিল হাওরের সৌন্দর্য্যের মাঝে হারিয়ে যাওয়ার। অথই জলরাশি আর ট্রালারে শুয়ে রাতের আকাশের তাঁরা গুনা, এক অভূতপূর্ণ অনুভূতি। আল্লাহ তালার অশেষ রহমতে অসাধারণ এক আবহাওয়াতে ঘুরে এসে ছিলাম।

হাওরের যাওয়ার বেস্ট টাইম হচ্ছে জুনের মাঝামাঝি থেকে সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত। তখন হাওর কানায় কানায় পূর্ণ থাকে গভীর, শীতল আর স্বচ্ছ জলরাশিতে।

যাত্রা পথে আমরা ছিলাম ৯ জন, ২ দিন আর ১ রাত, থাকব ট্রলারে। আমাদের রুট প্লান ছিলঃ

*ঢাকা টু সুনামগঞ্জ (এনা পরিবহন)
*সুনামগঞ্জ টু তাহেরপুর (লেগুনা রিজার্ভ ১০০০৳)
*তাহেরপুর টু টাঙ্গুয়ার হাওর – টেকের ঘাট (ট্রলার + বাবুর্চি ৬০০০৳)
*টেকের ঘাট টু জাদুকাটা (বাইকে ২৫০৳ ক্যাপাসিটি ২ জন) পথে ঘুরেছি
-নিলাদ্রী লেক
-লাকমাছড়া
-বাজাইছড়া
-শিমুলবাগান
-বারিক্কা টিলা আর
-জাদুকাটা নদী
*সবশেষে জাদুকাটা পার হয়ে বাইকে আবার সুনামগঞ্জ (১৫০৳ ক্যাপাসিটি ২ জন)
*সুনামগঞ্জ টু ঢাকা (এনা পরিবহন)

বুর্জ খলিফা: বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু স্থাপত্যশৈলীর গল্প

তাহেরপুরে পরিচিত ভাই থাকার সুবাধে উনিই ট্রালার আর বাবুর্চি আগে ঠিক করে রাখলেন।
ট্রলারের মাঝিঃ সেজুল মামা (01795805832)
বাবুর্চিঃ রুবেল (01747925047)
সাথে আগের দিনের হাট থেকে দেখে শুনে ২টা দেশি হাঁস রাতের খাবারের জন্য। তাহেরপুর পৌঁছে নাস্তা সেরে ভাগ হয়ে গেলাম ৩টা গ্রুপে।

১ম গ্রুপ সবার NID ফটোকপি সহ মাঝিকে নিয়ে থানায় জমা দিতে। কারণ আমি বিশ্বাস করি সব কিছুই একটা সিস্টেমে হওয়া উচিত।

২য় গ্রুপ কাঁচা বাজার করতে। এখানে বলতে হয় আমরা ২টা তাঁজা মাছ নিয়েছিলাম যার স্বাদ কেউ জীবনে ভুলতে পারবে না। আর

৩য় গ্রুপ মুদি সদাই কিনতে

দেরি না করে রওনা হলাম অজানা সৌন্দর্য্যের পথে। কেন যেন মনে হল চলন্ত ট্রলারের মাথায় পা ঝুলিয়ে না বসলে হয়ত টুরটায় বৃথা, অস্পূর্ণ থেকে যাবে। আহ্ পানির জটকা আর উন্মাদ বাতাস। এভাবেই যদি পার করে দিতে পারতাম বাকি জীবনটা!!!

টাঙ্গুয়ার হাওর

আধা ঘন্টার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম ওয়াচ টাওয়ার। তারপর শুরু হল লাফ-ঝাপ। আর হিজল বনের ভিতর সাঁতার কাঁটা। ঘন্টা খানেক বাদে একাংশ যখন ক্লান্ত হয়ে চেঞ্জ করে ভিতরে রেস্ট নিতে ব্যস্ত ঠিক তখনই আবিষ্কার করলাম জীবনের এক স্বরণীয় মূহুর্তের। টুরের সবচেয়ে ইনজয়ফুল ৩০ মিনিট। ইলশে গুরি বৃষ্টি আর ঝড়ো বাতাসে ট্রলারের মাথায় আবার পা ঝুলিয়ে এক সুরে…

“হাসতে দেখো গাইতে দেখো,
অনেক কথায় মুখর আমায় দেখো,
দেখো না কেও হাসি শেষে নিরবতা…
বুঝলনা কেউত….”

সাথে দেখলাম হাওরের ভয়ংকর সৌন্দর্য্য।
আল্লাহ সাক্ষী এ অনুভূতী জীবনে ভুলার মত না।

টেকেরঘাঁট পৌঁছতে পৌঁছতে দুপুরের খাবার সেরে নিলাম। বিকেলটা ঘুরলাম নীলাদ্রি লেকে। রাত কাটল গান গেয়ে, খোলা আকাশের তাঁরা গুনে তার সাথে ছিল হাঁসের রেজালা আর বার্বিকিউ দিয়ে।

সকাল সকাল উঠে নাস্তা করে বিদায় নিলাম ট্রলার থেকে। পূর্বের ঠিক করা বাইক নিয়ে বেরিয়ে পরলাম সুনামগঞ্জের বাকি সৌন্দর্য্য আহরণে। একে একে ঘুরে দেখলাম
-লাকমাছড়া
-বাজাইছড়া
-শিমুলবাগান
-বারিক্কা টিলা আর
-জাদুকাটা নদী

ভ্রমণ করে আসতে পারেন রাঙামাটি জেলার কাপ্তাই হ্রদ থেকে

*দিনটা শেষ হতে পারত হাসি-খুশি আর আনন্দে।
কিন্তু না, এক বুক কষ্ট আর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ফিরতে হল। আমরা জাদুকাটা নদী পার হওয়ার ঠিক ২০-৩০ মিনিট আগে নদীর এক পাশে নিখোঁজ হল একটা তরতাজা প্রাণ। পুলিশ আর স্থানীয়দের সহায়তায় পাক্কা ২ ঘন্টা পর খুঁজে পাওয়া গেল একটা যুবকের নিথর দেহ। জগন্নাথ ভার্সিটির ইংলিশ বিভাগের ভাইটির কথা দাগ কেঁটে থাকবে মনে। ভালো থেকো ভাই (০৪/০৮/২০১৮ ইং)।

***হাওরের ঘুরতে যাওয়ার পূর্বে যা যা অবশ্যই মনে রাখবঃ

১। টিম সিলেকশনঃ ভাই এটা একটা অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের মাঝে ৩ জন সাঁতার পারত না। আমরা বাকিরা তাদের সার্বোক্ষনিক চোখে চোখে রেখেছি। এতটুকু বলতে পারি টিমে এমন কয়েকজন ছিলাম যারা অত্যন্ত নিজের জীবন বাঁজি রেখে এগিয়ে যেতাম যে কোন বিপদে।
২। লাইফ জ্যাকেটঃ সাঁতার না জানা থাকলে এটা মাস্ট। আর ভাই নদী মাত্রিক দেশে বাস করে সাঁতারটা কেনই বা আমরা শিখে নেই না। না আমরা এটাকে কোন গুরুত্বই দেই না।😣

৩। মাঝি সিলেকশনঃ আমাদের মাঝি সেজুল মামার কথা না বললেই নয়। হাওরের মানুষ সম্পর্কে ধারণা পেলাম তাকে দেখে। এত ভদ্র আর হেল্পফুল মানুষ দেশের আর কোথাও ঘুরতে গিয়ে পেয়েছি বলে মনে হয় না। মামাকে আমরা আগেই বলে নিয়েছি আমাদের দূর্বলতার কথা, যারা সাঁতার পারে না তাদের দিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে। অবাক ব্যপার মামা এখনও কল করে খোঁজ খবর নেয়, কেমন আছি সবাই!!!

আম দিয়ে রূপচর্চা করতে পারেন যেভাবে

৪। জাদুকাটাতে সাবধাণতাঃ পরিবেশ নষ্টের দিক দিয়ে বিশ্বে আমরা কত নাম্বার তার আপডেটটা আমার এই মূহুর্তে জানা নেই। পাথর তুলে শেষ করে দিয়েছি পুরো সিলেটটা। যার ফলে জাদুকাটাতে তৈরী হয়েছে মরন ফাঁদ। হাঁটু পানিতে নামলেও হঠাৎ করে পরতে পারেন বিশাল গর্তে, যা পানির কারণে আগ থেকে বুঝা সম্ভব না। সুতরাং সাবধানতা অবলম্বন না করে উপায় নাই।

৫। নিলাদ্রী লেকঃ এক পরিচিত ভাইয়ের কাছে শুনেছি নিলাদ্রী লেক গভীরতা শ’খানেক ফুটের কম হবে না। উনি উনার শৈশব কাঁটিয়েছেন টেকেরঘাঁটে। এখানে নামায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে যা মেনে চলাই শ্রেয়।

৬। সর্বোপরী, সবচেয়ে মূল্যবান বিষয়টা হল পরিবেশের সুরক্ষা। বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবো এক টুকরা ময়লাও (অপচনশীল) আমরা বাইরে ফেলিনি। ভাই পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে না পারলে আপনার ঘুরার দরকার নাই। 

যাবেন নাকি টাঙ্গুয়ার হাওর এ!

Source Link

  • 1
    Share

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *