আন্ডারগ্র্যাড শেষ করার পর বেশিরভাগ ছাত্রের মত আমারও ইচ্ছা ছিল দেশের বাইরে এসে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার এবং বেশিরভাগ ছাত্রের মতই আমারও কোন ধারণা ছিল না বিদেশে উচ্চশিক্ষা বিষয়টা কী, এটা কীভাবে অর্জন করা যেতে পারে আর অর্জন করলে লাভই বা কী? জিআরই না দিলে ভিসা দেয় না - কনসেপ্টটা মোটামুটি এরকম লেভেলের ছিল। আরও কিছু হাস্যকর কনসেপ্ট ছিল যেমন, ইউনিভার্সিটিতে চাকরি না করে অন্য কোথাও চাকরি করলে স্কলারশিপ পাওয়া যায় না, পাবলিকেশন না থাকলে এডমিশন হয় না, ইত্যাদি। আসলে এই রকম হাস্যকর ধারণাগুলোর জন্যে আমি আমার সেই সময়টাকে, অর্থ্যৎ বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে সদ্য ব্যাচেলর ডিগ্রি শেষ করা একটা ছাত্রকে খুব একটা দোষারোপ করি না। আগে শিক্ষকদের করতাম, মনে হত, শিক্ষকরাই তো কখনও বুঝিয়ে বলেনি বিষয়টা কেমন, আমার কী দোষ, এখন শিক্ষকদেরও আর করি না। এখন বুঝি যে, বেশিরভাগ শিক্ষকের দৌড় তো ছিল জাহাঙ্গীরনগর বা বুয়েট থেকে মাস্টার্স বা পিএইচডি পর্যন্ত তাঁদের পক্ষে এই ধরণের গাইডলাইন দেয়া আসলে অসম্ভব ছিল। তো আমরা যাঁরা যাঁরা দেশের বাইরে পড়তে আসতে চাইতাম, নিজেরা নিজেরাই এইসব নিয়ে টুকটাক আলোচনা করতাম। ‘পাবলিকেশন না থাকলে এডমিশন হয় না, যত বেশি পাবলিকেশন তত বেশি এডমিশনের চান্স’ - এই ভয়/ধারণা থেকে তখন আমি বেশ কিছু পাবলিকেশন করার চেষ্টা করি।
| ভুয়া জার্নাল |
যেহেতু সত্যিকার অর্থে আমার কোন গাইডলাইন ছিল না, আমার আন্ডারগ্র্যাডের থিসিসটা ছাড়া আসলে তখন আমার বলার মত কোন ‘রিসার্চ’ ছিল না। তবু স্ট্যামফোর্ডে জয়েন করার পর আমি নিজের চেষ্টায় নিজের কিছু আইডিয়ার প্রোটোটাইপ তৈরীর চেষ্টা করি এবং কিছু ফলাফল পাই। সেগুলো খুব উন্নত মানের গবেষণাকর্ম ছিল তা নয়, তবে তখন আমার মাথার উপর দেশ ছাড়ার এক্সট্রিম প্রেশার ও দেশের বাইরে পড়তে যাবার তীব্র আকাঙ্খা থাকায় সেগুলোকেই আমার কাছে আইনস্টাইনের লেভেলের আবিষ্কার বলে মনে হতে থাকে। এটা ঠিক যে কাজগুলো একদম ফেলে দেয়ার মত ছিল না, আইডিয়াগুলো ভাল ছিল, হয়তো ফলাফলকে যেভাবে ভ্যালিডেট করতে হয় সেটা জানতাম না দেখে ইচ্ছামত প্রাপ্ত ফলাফলকে ব্যাখ্যা করেছিলাম। আমি এখন যখন সেই কাজগুলো আবার দেখি, আমার মনে হয় যে সেগুলোকে কিছুটা গাইডলাইন পেলে, একটু বুঝতে পারলে সেগুলো অন্তত মাঝারি মানের কিছু কনফারেন্সের উপযোগী আমি করতে পারতাম। যাহোক, লিখে ফেললাম কিছু পেপার সেইসব কাজের প্রাপ্ত ফলাফলের উপর ভিত্তি করে।
তখন পর্যন্ত বুঝিনি যে, এগুলোর মধ্যে ৯০ শতাংশই আসলে ভুয়া জার্নাল। এরা মোটেও পেপার রিভিউ করে না, পড়েও দেখে না। আমার মতো যারা বোকা এবং বুঝে না, তাদের আরও বোকা বানিয়ে টাকা কামানোই হচ্ছে এদের মূল ব্যবসা।
এখন পাবলিশ করব কোথায়? একে তো হাতে সময় আছে মাস দুয়েক, এই মাস দুয়েকের মাঝেই আমাকে দেশের বাইরে ভর্তির জন্যে আবেদন করতে হবে এবং যেহেতু মনে দৃঢ় বিশ্বাস যে পাবলিকেশন না থাকলে এডমিশন হবে না, তাই যে কোন মূল্যে হোক এগুলো মাস দুয়েকের মাঝেই পাবলিশ করতে হবে। পাবলিশ হয়ে গেলে আমি সেগুলো ইনক্লুড করে এবার এডমিশন ও স্কলারশিপের জন্যে নিশ্চিন্তে আবেদন করতে পারি। দ্বিতীয়ত, যেহেতু জানতাম না যে কনফারেন্স কী জিনিস আর জার্নাল কী জিনিস, কোনটা খায় আর কোনটা মাথায় দেয়, কোনটা ভাল আর কোনটা মন্দ, কোনটা ভগিচগি জার্নাল আর কোনটা সত্যিকারের জার্নাল কাজেই ইন্টারনেটে খুঁজেপেতে কিছু জার্নাল বের করলাম। শুধু জানতাম যে জার্নাল ভাল কি মন্দ সেটা বুঝার একটা প্যারামিটার হচ্ছে ‘ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর’, কাজেই যেইসব জার্নালের ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর বেশি এবং একই সঙ্গে সপ্তাহ দুয়েকের মাঝে পাবলিশ করা যায়, সেগুলোতেই পাবলিশ করার ইচ্ছা পোষণ করলাম। আমার কোন ধারণা ছিল না যে দুই সপ্তাহের মাঝে আসলে যে একটা পেপার পিয়ার রিভিউ করা সম্ভব না, ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর কীভাবে হিসাব করতে হয়, এটা যে কেউ মিথ্যা একটা সংখ্যা জাস্ট ওয়েবসাইটে দিয়ে রেখে নিজেদের বিরাট বড় জার্নাল দাবী করতে পারে- এই সম্পর্কে আমি সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিলাম। হয়তো সময় নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলে বুঝতাম, তবে একদিকে স্ট্রিক্ট টাইমলাইন, আরেকদিকে এক্সট্রিম প্রেশার, আমার চোখেমুখে অন্ধকার দেখতে দেখতে কী মনে করে আমি বেশ কিছু জার্নালে ও কনফারেন্সে আমার গবেষণাপত্রগুলো পাঠিয়ে দিতে থাকলাম।
সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতেই তাঁরা রিপ্লাই দিতে থাকলেন যে আমাদের গবেষণাকর্মগুলো প্রকাশনার জন্যে মনোনীত হয়েছে, এবারে পাবলিকেশন ফি দিলেই গবেষণাকর্মটি জার্নালটির আগামী ইস্যুতে প্রকাশিত করা হবে। খুশি তো আমার আর ধরে না, যদি খুব খারাপ কাজ হতো, সেটা কি তাঁরা কখনও একসেপ্ট করতেন? নিশ্চয়ই না।পাবলিকশেন ফি চেয়েছে? সেটা তো লাগবেই, প্রকাশনার একটা খরচ আছে না? লিফলেট ছাপাতেও তো টাকা লাগে, আর জার্নাল ছাপাতে লাগবে না? মানুষ আসলে যা করতে চায় সেভাবেই যুক্তি সাজিয়ে নেয়, তাই ইত্যাদি নানাবিধ যুক্তিতর্ক নিজের মত করে সাজিয়ে নিয়ে আমিও সেই জার্নালগুলোতে টাকা পয়সা পাঠিয়ে দিলাম। দেশের বাইরে তখন টাকা পাঠানো যেত না, সম্ভবত এখনও যায় না, আমি দুনিয়ার সব ব্যাংক ঘুরে ঘুরে এর থেকে ওর থেকে খোঁজ নিয়ে কারও পেপালে ব্যালান্স আছে এমন মানুষ খুঁজে বের করে তাঁকে আগে ক্যাশ দিয়ে তারপরে জার্নালগুলোর পাঠানো পেপাল ঠিকানায় টাকা পাঠিয়ে প্রকাশনার বিষয়গুলো নিশ্চিত করলাম। আমি তখন পর্যন্ত বুঝিনি যে জার্নালগুলোর মাঝে ৯০%ই আসলে ভুয়া জার্নাল, এরা মোটেও পেপার রিভিউ করে না, পড়েও দেখে না, আমার মত যাঁরা বোকা এবং বুঝে না - তাঁদের আরও বোকা বানিয়ে টাকা কামানোই হচ্ছে এঁদের মূল ব্যবসা।
যাহোক, পাবলিকেশন হয়ে গেল। দু মাসের টার্গেট নিয়েছিলাম, আড়াই মাসের মাথায় আমার চারটা জার্নাল (যার মাঝে তিনটা ১০০% ভুয়া, একটা ভুয়া না হলেও অত্যন্ত নিম্নমানের) এবং দু’টা কনফারেন্সে (বুয়েটের একটা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা) পাবলিকেশন হয়ে গেল। সেই জার্নালগুলোর মান নিয়ে কলিগ ও বন্ধুবান্ধবদের মাঝে কেউ কেউ যে আপত্তি করেননি তা নয়, তবে ঐ যে বললাম না, মানুষ যা চায় তেমন করেই যুক্তি সাজিয়ে নেয়, কাজেই সেই ভুয়া জার্নালগুলোতে প্রকাশ করা পেপার দিয়েই যখন এডমিশন ও স্কলারশিপ দু’টাই পেয়ে গেলাম, তখন সেই আপত্তি করা বন্ধু-কলিগদের গিয়ে বললাম, হে হে, জার্নাল যদি এতই খারাপ হত, ওঁরা কি এডমিশন ও স্কলারশিপ দিতেন? নর্থ আমেরিকার প্রফেসররা কি ঘাস খায়? যাহোক, সেসব দিন চলে গেল, জিআরই এর সঙ্গে যে ভিসার কোন সম্পর্ক নেই বুঝতে পারলাম, এবং আরও অনেক কিছু বুঝে শুনে একদিন দেশ ছেড়ে কানাডায় উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণে বিমানে চেপে বসলাম।
দিন কাটছিল ভালই, প্রফেসর মুসলিম, তাঁর ছাত্র-ছাত্রীরাও সবাই মুসলিম এবং এরাবিক এথনিসিটির, গেলে খাঁটি আরবী উচ্চারণে ‘সালামে য়ালেকুম’, ‘হ্বামদেল্লা’, ‘ইনশাল্লাহ খায়ের’ ইত্যাদি বলতে বলতে মাঝে মাঝে মনে হতো আরব কোন দেশে বসবাস করছি হয়তো। আস্তে আস্তে পেপার পড়তে পড়তে, খুঁজতে খুঁজতে, প্রেজেন্ট করতে করতে, অন্যদের প্রেজেন্টেশন দেখতে দেখতে, প্রেজেন্টাররে বক্তব্যকে বাকিরা কীভাবে এটাক করে সেটা দেখতে দেখতে, গবেষণাপত্রে দাবী করা রেজাল্টকে কীভাবে ক্রিটিকালি ইন্টারপ্রেট করা যায় সেটা শিখতে শিখতে - একসময় বুঝে গেলাম যে আসলে গবেষণা এত সোজা বিষয় না। বুঝে গেলাম ভাল জার্নাল/কনফারেন্স কীভাবে চিনতে হয়, কোনটা জাস্ট গার্বেজ আর কোনটা সত্যিকারের ভাল কাজ এই আন্ডারস্ট্যান্ডিংটা আস্তে আস্তে হয়ে গেল। সব গ্র্যাজুয়েট ছাত্রকে বাধ্যতামূলক ভাবে রিসার্চ এথিকস এর কোর্স করতে হত, সেখান থেকেও অনেক ধারণা পরিষ্কার হয়ে আসল।
২০১৪ এর সামারে আমার প্রফেসরের কাছে ট্রান্সফার হয়ে এক সউদি ছাত্রী আসল। সউদি ছাত্রী প্রতিদিন একটি বিষয়ের উপর নানাবিধ পেপার পড়ে এসে সেগুলো প্রেজেন্ট করে। একদিন দেখলাম সে আমার সেই ভুয়া জার্নালগুলোতে প্রকাশ করা সেই গবেষণাপত্রগুলো, যেগুলোর কথা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম কানাডায় আসার পরে, সেখান থেকে একটা পেপার ডাউনলোড করে নিয়ে এসেছে প্রেজেন্ট করতে! ভয়ের একটা শীতল স্রোত শিড়দাঁড়া বেয়ে নেমে গেল দ্রুত। পালিয়ে যাওয়ার উপায় তো নেই, তাই চোখমুখ শক্ত করে বসে রইলাম। মনে মনে বলছিলাম, শালার সউদি মাইয়া দুনিয়ায় আর তুই পেপার খুঁইজা পাইলিনা বদ ছেমড়ি কুনহানকার, এইডাই তর ডাউনলোড কইরা আনা দরকার আছিল!
প্রেজেন্টেশন শুরু হল, পেপারকে যেভাবে আমরা এটাক করে অভ্যস্ত সেভাবে সবাই এটাক করা শুরু করল। হাসাহাসি শুরু করল। পার্থক্য এই যে, অন্যান্যদিন আক্রমণে আমিও অংশ নেই, আজ আমি মাথা নিচু করে বসে রইলাম। ধরণী দ্বিধা হওয়া বা লজ্জ্বায় মাটিতে মিশে যাওয়া টাইপ যেই প্রবাদটি আছে, সেটার মর্ম একদম ‘মর্মে মর্মে’ উপলব্ধি করলাম সেদিন, মনে হচ্ছিল মাটির নিচে মাথা ঢুকিয়ে বসে থাকতে পারলে খারাপ হত না। যাহোক, সকল অপমানেরই শেষ আছে, একসময় সেই প্রেজেন্টেশন শেষ হল। সবাই ভদ্র ভাষায় জানতে চাইল, ‘এই বালডা কেডা লেখছে?’। দেখা গেল যে অথরের নাম আর আমার নাম একই, সেটা নিয়েও একচোট হাসাহাসি হয়ে গেল। তবে কেউ আমাকে সরাসরি বলল না যে, আমিই এই কর্ম করে এসেছি অতীতে।
সেদিন সন্ধ্যায় আমার সুপারভাইজর আমাকে তাঁর অফিসে ডাকলেন। বললেন, দেখ আজকে যেই পেপারটা আলোচনা করা হয়েছে সেটার অথর যে তুমি সেটা আমি জানি।
আমি চুপ করে রইলাম।
তিনি বললেন, ইটস ওকে। আমি বুঝতে পারছি যে সেই সময়ে তোমার কোন ধারণা ছিল না যে কী করতে হবে, কোথায় করতে হবে, কীভাবে করতে হবে। তুমি একা নও, তোমার মত এমন ছাত্র আমরা প্রতি বছরই দেখি। ইউ আর জাস্ট ভিকটিম।
আমি কিছু বললাম না।
তিনি বললেন, যাহোক, তোমাকে হিউমিলিয়েট করা আমার উদ্দেশ্য ছিল না। আমি চেয়েছিলাম তুমি যেন একদম ভিতর থেকে বুঝতে পার যে আসলে একটা রিসার্চ ওয়ার্ক কীভাবে করতে হয়, জাস্ট এন আইডিয়া ইজ নট এনাফ। একটা আইডিয়াকে সত্যিকার অর্থে কাজ করে এবং সেই কাজটা একটা বাস্তব সমস্যার সমাধান করে এমন অবস্থায় নিয়ে এসে সেটাকে যুক্তিসঙ্গতভাবে উপস্থাপন করতে পারাটাই হচ্ছে রিসার্চ।
আমি বললাম, আমি এখন বুঝতে পারছি। আসলে এখানে এসে মাস তিনেকের মাঝেই সেটা বুঝেছি, তবে অলরেডি অনেক দেরী হয়ে গেছে। আমি তো আর সেটা এখন ফেরাতে পারব না।
প্রফেসর বললেন, সেটা ঠিক আছে। ফেরানোর প্রয়োজন নাই। তবে ভবিষ্যতে এইসব ফালতু জায়গায় নিজের আইডিয়া পাঠিয়ে নিজেকে হাস্যরসের পাত্রে পরিণত কোরো না। আর এই রেফারেন্সগুলোও কোথাও চাকরি বাকরির জন্যে দিও না। কেউ যদি এটা খুঁজে দেখে, সে তোমার ‘রিসার্চ এথিকস’ নিয়েই প্রশ্ন তুলবে।
আমি সেরাতে সবগুলো জার্নালকে ইমেইল করে বললাম আমি আমার পাবলিকেশনগুলো উইথড্র করতে চাই। একটা মাত্র জার্নাল রিপ্লাই দিল কয়েকদিন পর (যেটা ভুয়া না, তবে নিম্নমানের ছিল) যে যেহেতু আমি মনে করছি আমার রেজাল্ট আবার পুনর্বিবেচনা করতে হবে, আমি যতদিন সেটা না করছি ওরা পাবলিকেশনটা হোল্ড করে রাখবে। বাকিরা রিপ্লাই-ই দিল না। বুঝলাম যে এঁরা যেই ইমেইল করলে টাকা পাওয়া যাবে না সেই ইমেইলের রিপ্লাই দেয়ারও প্রয়োজন বোধ করে না।
এই ঘটনাটা আমি অনেককে মুখে মুখে বলেছি, ব্যক্তিগতভাবে বলেছি, বুঝানো চেষ্টা করেছি যে - না জানা থাকার কারণে হাই ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর, ফাস্ট পিয়ার রিভিউড পাবলিকেশন উইদিন টু উইকস, লো পাবলিকেশন ফি - এইসব কথা যাঁরা বলে জার্নাল বের করেন সেগুলো আসলে ভুয়া। কেউ হয়তো বিশ্বাস করেছে, কেউ করেনি। যাঁরা করেনি আমি তাঁদের মোটেও দোষ দেই না। আসলে আন্ডারগ্র্যাড শেষ করার পর সময়টাই তেমন। বিশ্বাস করার কথা না। তবু বলেছি। কেউ কেউকে এটাও বলেছি যে চাকরির আবেদনপত্রে এই ভুয়া কনফারেন্স বা জার্নালে যে প্রকাশনা আছে সেটা না উল্লেখ করতে। তাঁরা ভেবেছেন যে আমি চাই যেন তাঁদের চাকরি না হয়। তাঁরা রাগ করে আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন। আমি তাঁদের রাগেও কিছু মনে করিনি। হতেই পারে। তবে আমি যে ঘর ভর্তি পুরো ল্যাবের সব মেম্বারদের সামনে অপমানিত হয়ে পঁয়তাল্লিশ মিনিট মাথা নিচু করে বসে ছিলাম, যদিও কেউ আমাকে একটা শব্দও বলেনি, তবু যে সব হাসাহাসির মূল লক্ষ্যবস্তু আমিই ছিলাম - সেটা তো আমি ভুলতে পারি না একটা দিনের জন্যও। আমি সত্যিই চাইনা যে কেউ আমার মত এই অপমানটা আর বোধ করুক। আমার প্রফেসর একজন মহামানব টাইপ মানুষ ছিলেন, তিনি আমাকে আলাদা করে বুঝিয়ে বলেছেন বিষয়টা, তবে সব প্রফেসর এমন না। এইসব কারণে কারও রিসার্চ এথিকস নিয়ে প্রশ্ন উঠাটা অসম্ভব না, যদিও বিষয়টা জাস্ট ইনফরমেশন গ্যাপের কারণে বা পরিস্থিতির কারণে ‘ভিক্টিম’ হয়ে যাওয়া। তাই আমি দীর্ঘদিন ধরে ভাবছিলাম বিষয়টা লিখে রাখব, যেন ছাত্ররা সচেতন হন, তাঁদেরকে এমন লজ্জাজনক ও বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি না হতে হয়, একই সঙ্গে নিজের করে আসা ভুলেরও একটা কনফেশন এর সুযোগ হয়।
ছাত্রদেরকে বলতে চাই যে, একজন আন্ডারগ্র্যাডের ছাত্রের কোন পাবলিকেশন থাকবে জার্নালে এটা নিয়ারলি ইমপসিবল একটা বিষয়। কাজেই সেটা করে (তাও তিনটা চারটা) ভর্তির জন্যে আবেদন করার প্রয়োজন নাই মোটেও। ভর্তির ক্ষেত্রে এইসব ভুয়া পাবলিকেশন মোটেও বিবেচ্য বিষয় না, বরং কোন কোন ক্ষেত্রে এইসব ভুয়া পাবলিকেশন দিলে আপনার ভর্তির অফার পাবার সম্ভাবনাই কমে যায়। প্লিজ এই কাজটা করবেন না। সলিড আপনার প্রোফাইলে যা কিছু আছে, সেগুলোই দিন - যথেষ্ট। বুয়েটের বা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফারেন্স দু’টা একদম ভুয়া ছিল না, প্রয়োজনে দেশের মাঝে এইসব কনফারেন্সে পেপার/আইডিয়া পাঠানোর চেষ্টা করেন। শুভ কামনা।
মাহমুদ হাসান: সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, আইবিএম।